মোঃ জাকির হোসেন , রাজশাহীঃ
দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসে,বে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললেও বাস্তব চিত্র এখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন। রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি সংসদীয় আসনে এবার ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার গণ-সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাররা। ধারাবাহিক কটূক্তি, শারীরিক ও মানসিক হয়রানি এবং ভোটকেন্দ্রে সুনির্দিষ্ট বুথ না থাকার প্রতিবাদে তারা এই ‘মৌন ধর্মঘট’ বা ভোট বর্জনের পথ বেছে নিয়েছেন।
ভোটকেন্দ্রে গেলেই তাদের পড়তে হয় এক চরম পরিচয় সংকটে। ভোটারদের অভিযোগ:
নারীদের লাইনে দাঁড়ালে সাধারণ নারী ভোটাররা অস্বস্তি প্রকাশ করেন এবং তাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
পুরুষদের লাইনে গেলে জোটে বিদ্রূপ ও তাচ্ছিল্য। এমনকি অনেক সময় লাইন থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমানের মতে, তাদের জন্য আলাদা কোনো বুথ নেই; নারী বা পুরুষ যে কোনো লাইনে তারা ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই ‘উন্মুক্ত’ নিয়মটিই তাদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মারুফ নামে একজন বলেন, এনআইডিতে আমার নাম মারুফ, কিন্তু সামাজিকভাবে আমি পূর্ণিমা। ২০১৮ সালে ভোট দিতে গিয়ে যে অপমান সহ্য করেছি, তারপর আর কোনোদিন কেন্দ্রের দিকে পা বাড়াইনি। — মিস পূর্ণিমা (৩৭), ৩ নম্বর ওয়ার্ড, রাজশাহী।
নওগাঁ থেকে আসা বিজলি জানান, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তাকে লাইনে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। এমনকি দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের জানিয়েও তিনি কোনো প্রতিকার পাননি। অন্যদিকে, নওহাটার রাত্রি জানান, তাদের পোশাক ও শারীরিক গঠন দেখলেই কেন্দ্রের প্রবেশপথে বাধা দেওয়া হয়।
রাজশাহীর প্রভাবশালী সংগঠন ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ এই বর্জনের সিদ্ধান্তের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনের তথ্যমতে, রাজশাহী জেলা ও মহানগরে তাদের সদস্য সংখ্যা ১,২১১ জন হলেও সরকারি তালিকায় ৩৯টি আসনে মাত্র ১৭২ জনকে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সংগঠনটির নেত্রী এবং নির্বাচিত কাউন্সিলর সাগরিকা নিজেও এবার ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলো এখনো আমাদের জন্য সংবেদনশীল নয়। কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও আলাদা বুথ না থাকলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
রাজশাহীর নারী আইনজীবী আইরিন সুলতানা মনে করেন, শুধু এনআইডিতে নাম থাকলেই ভোটাধিকার নিশ্চিত হয় না। যতক্ষণ না সমাজে তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে এবং আইনিভাবে বিশেষ ব্যবস্থা (যেমন: আলাদা বুথ) করা হচ্ছে, ততক্ষণ এই বৈষম্য দূর হবে না। সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নাহিদা পারভিন বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য।
অগ্রগামী প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্হার রবিউল ইসলাম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হোক বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ—ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের অধিকার এবং সেখানে মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ পাওয়া সবার সাংবিধানিক অধিকার। শুধু এনআইডি কার্ড দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; ভোটকেন্দ্রে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট বুথ বা অন্তত সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল।