দেলোয়ার হোসাইন (ভূঁইয়া), চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা-এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের আড়ালে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ভরাট, ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি এবং সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক নিরবতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল শত শত একর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এশিয়ার মধ্যেই সবচেয়ে উপযোগী শিল্প এলাকা হিসাবে মিরসরাইয়ের মধ্যেই ইকোনমিক জোন সরকার ঘোষণা করলে ও কিছু বিচ্ছিন্ন কোম্পানি জমির দালাল ও বালু খেকুদের মাধ্যমে হাজারো অনিয়মের মাধ্যমে, এস,আলম গ্রুপের মতো দেশের সম্পদ লুটেপুটে চেটে খাওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন!
উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়ন-এর পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজায় দুটি স্কেভেটর দিয়ে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে চারপাশে ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত উঁচু করে ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সমুদ্র থেকে বালু এনে কৃষিজমি ভরাট করে সেখানে শিল্পকারখানা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, এর আগেও একই এলাকায় বালু উত্তোলনের চেষ্টা হলে কৃষকরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তা প্রতিহত করেন। পরে শত শত কৃষক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। বিষয়টি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলেও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্পেসিফিক জিন্স-এর কর্ণধার ও আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ এম তানভীর-এর ভাড়াটিয়া লোকজন এই ভরাটকাজে জড়িত। তবে এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সৈয়দপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আইনজীবী অ্যাডভোকেট হোসাইন আশরাফ বলেন,
“একদিকে কৃষিজমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্র থেকে বালু এনে জমি ভরাট করা হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
তার দাবি, একটি সিন্ডিকেট আর্থিক চাপ বা প্রলোভন দেখিয়ে কৃষকদের জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
একইভাবে উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন-এর মগপুকুর এলাকায় ‘অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় একশ একর জমি ভরাটের কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েকশ পরিবার জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় রয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে একটি জামে মসজিদ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।
এছাড়া কারখানা স্থাপনের নামে বাঁশবাড়িয়া এলাকায় আর আর জুট মিল-এর পশ্চিম পাশেও কয়েকশ একর কৃষিজমি ভরাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাবেক মেম্বার আবুল মুনসুর জানান, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক -এ সংবাদ প্রকাশের পর এসিল্যান্ড মালিকপক্ষকে কাজ বন্ধ রাখার জন্য নোটিশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
একইভাবে আর আর জুট মিলের পশ্চিম দিকে কয়েকশো একর কৃষি জমি ভরাট করছে তসলিম নামে এক শিল্পপতি। প্রভাবশালী এসব শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস করে না। তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার ফোন করলো তসলিম উদ্দিন মোবাইল রিসিভ করেননি।
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন,
“নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের সময় কেউ সুযোগ নিয়ে ফসলি জমি নষ্ট করে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ কেন নেই?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমি ভরাট ও বালু উত্তোলন করলে—
কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তিত হতে পারে
জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেতে পারে
জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
উপকূলীয় ক্ষয় ত্বরান্বিত হতে পারে
উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জনজীবন, খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি
স্থানীয়দের জোর দাবি—
অবিলম্বে অবৈধ ভরাট ও বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে
কৃষিজমি সুরক্ষায় কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে
পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ছাড়া কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া যাবে না
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে
তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে—যার খেসারত দিতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।