শহিদুল ইসলাম, নিকলী,কিশোরগঞ্জ:
মঙ্গলবার ৫/০৫/২৬
টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। দিগন্তজোড়া সোনালি বোরো ধান ঘরে তোলার আগেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক ফসলি জমি। প্রকৃতির এই নির্মম রূপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক, যাদের সারা বছরের একমাত্র স্বপ্ন ও জীবিকার ভরসা ছিল এই ফসল।
হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোমরসমান পানির নিচে ডুবে আছে পাকা ধান, আবার কোথাও কৃষকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানিতে নেমে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান কাটছেন। অনেকেই নৌকায় করে ধান এনে নদীর পাড়ে জড়ো করছেন, পরে সেখান থেকে গাড়িতে বাড়ি নিতে হচ্ছে। অথচ শ্রমিক সংকট, অতিরিক্ত মজুরি এবং কৃষিযন্ত্রের সীমাবদ্ধতায় কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে গেছে।
বর্তমানে একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় পৌঁছেছে। বিপরীতে বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। এছাড়া প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্বাইন হারভেস্টার না থাকায় দ্রুত ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রতিদিনই পানির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত কৃষকের স্বপ্ন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে বিএনপি নেতা আতিকুল ইসলাম হেলিম
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় নিকলী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম উপজেলার বিভিন্ন প্লাবিত হাওর এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে তিনি সিংপুর ইউনিয়নের গোড়াদিঘা, বড়াইল, ফেনাগুনা, বরুলিয়া, মাটিকাটা, দিঘলা ও বরগুনাসহ বিস্তীর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল ঘুরে দেখেন এবং কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন।
হাওরের অধিকাংশ পাকা ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চোখের সামনে ফসল হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ধারদেনা করে আবাদ করা ফসল হারিয়ে তাদের সামনে নেমে এসেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
স্থানীয় এক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন,
“বছরের ছয় মাস পানি আর ছয় মাস শুকনো—এই চক্রের মধ্যেই আমাদের জীবন। ধানই আমাদের একমাত্র সম্বল। সেটাও যদি বানের জলে ভেসে যায়, তাহলে পরিবার নিয়ে বাঁচার পথ কোথায়?”
এ সময় আতিকুল ইসলাম হেলিম কৃষকদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা জনগণের সেবক হিসেবে মাঠে আছি। এই দুর্দিনে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো শুধু রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের মানবিক ও নৈতিক কর্তব্য। কোনো কৃষক যেন নিজেকে একা মনে না করেন—আমরা সর্বশক্তি দিয়ে তাদের পাশে থাকব।”
তার এই উপস্থিতি ও সহমর্মিতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার হয়েছে।
জরুরি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি
এদিকে, নিকলীসহ দেশের হাওরাঞ্চলের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদারের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কৃষি পুনর্বাসন, সহজ শর্তে ঋণ, প্রণোদনা এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থা, আগাম সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
নিকলীর হাওরে আজ যে হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে, তা শুধু একটি অঞ্চলের সংকট নয়—এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষকের জীবনমান এবং মানবিক সহমর্মিতার এক কঠিন পরীক্ষা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।