শহিদুল ইসলাম,নিকলী:
৬ এপ্রিল ২০২৬,
নিকলীর জারইতলাতেও ভিজিএফের ৩৩০০ কেজি চাল জব্দ। ইউপি পরিষদের একাধিক কক্ষে ডাবল তালা দিয়ে দরজা বন্ধের দৃশ্য মিলে সরেজমিনে। এই বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তৎপর হলেই টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। একের পর এক সীমাহীন অভিযোগ সত্ত্বেও দায়িত্বে থাকা প্যানেল চেয়ারম্যান দায় এড়ানোর চেষ্টায় মত্ত। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের জব্দকৃত দুস্থ অসহায়দের চাউল এতিম খানায় বিতরণ করা হবে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে দুস্থ অসহায়ের জন্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ১০ কেজি করে চাউল দেয়ার অনুমতি থাকলেও অধিকাংশরা পাননি ১০ কেজির সমপরিমাণ চাউল। এছাড়াও অনেকের নামে কার্ড হলেও স্বজনপ্রীতি আর অনিয়মের কারণে প্রকৃত অসহায়েরা অধিকারবঞ্চিত হয়েছেন। প্রকৃত অসহায়েরা না পেয়ে কর্তৃপক্ষের স্বজনপ্রীতির কারণে তুলনামূলক সামর্থ্যবানেরা সেই চাল পেয়ে যান তখন গুণগত মানের প্রশ্নে সেখানকার দালালদের কাছে কম টাকা মূল্যে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানাগেছে, গত ১৯ মার্চ ঈদুল ফিতর উপলক্ষে জারইতলাতে ৩ হাজার ৭০০ লোকের মাঝে ১০ কেজি করে মোট ৩৭ হাজার কেজি চাউল ৩ দিনের মধ্যে বিতরণের লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরি মধ্যে প্রথম দিনেই ৩৩০০ কেজি চাউল জব্দ করেন টেগ অফিসারের দায়িত্বে থাকা নিকলী উপজেলার চৌকস সমাজ সেবা অফিসার আসিফ ইমতিয়াজ মনির।
দায়িত্বে থাকা এ কর্মকর্তার কাছে ত্রানের চাউল ক্রয়ের লক্ষ্যে কাছাকাছি অবস্থানে একটি দালাল চক্রের অনিয়মের দৃশ্য ধরা পড়ে। এমন দৃশ্যে তাৎক্ষণিক তিনি এসব মালামাল জব্দের লক্ষ্যে নিকলীর ইউএনও রেহেনা মজুমদার মুক্তির সাথে কথা বলেন। মুক্তির নির্দেশ মোতাবেক তিনি এসব চাউল জব্দ করেন বলে জানান। পরবর্তীতে ইউনিয়ন অফিসের কক্ষেই ডাবল তালা দিয়ে আটক করে রাখার কথাও স্বীকার করেন। তবে অনিয়ম এবং সেখানকার চালের গুণগত মানের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দুস্থ অসহায়ের সাথে কথা হলে তারা চালের পরিপূর্ণ ওজন থেকে শুরু করে গুণগত মানের বিষয়ে সীমাহীন অনিয়মের কথা তুলে ধরেন। এছাড়াও সুবিধাবঞ্চিত অসংখ্য অসহায়ের সাথে কথা হলে চেয়ারম্যানের স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়মের কথা তুলে ধরেন।
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম ঘিরে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অযোগ্য অসংখ্য ইউপি প্যানেল চেয়ারম্যানের যোগসাজশে তাদের অধীনস্থ থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের আঁতাতে চলে অনিয়মের খেলা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানকার প্যানেল চেয়ারম্যান বনে যান অনেকটা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবে আর আত্মগোপনে থাকা ক্ষমতাচ্যুত চেয়ারম্যানদের সাথে আঁতাত করে নাটকীয়ভাবে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে বিগত সময়ের অধিকাংশ চেয়ারম্যানেরা আওয়ামীগের প্রভাবে কৌশলিক কায়দার নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পরবর্তীতে অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান অনেকেই। ৫নং জারইতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজমল হোসেনও অসুস্থতার অজুহাতে গ্রেফতার ভয়ে আত্মগোপনে পরিষদ ছাড়ে। এরপর থেকেই ২নং ওর্য়াডের ইসহাক রানা দলীয় প্রভাবের কৌশল খাটিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বনে যান বলে গুঞ্জন উঠে। দলীয় প্রভাবের এমন বাস্তবতা মিলে ইসহাক রানার ইউনিয়ন পরিষদের অফিসের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে যখন একেরপর এক কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাকর্মীদেরকে সেই চেয়ারে বসিয়ে রাখেন। যদিও পরবতীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব নেতাসহ প্যানেল চেয়ারম্যান ইসহাক রানা দলের সাংগঠনিক নিয়ম অবমাননার দায়ে বিএনপির যাবতীয় পদ পদবী থেকে বহিষ্কৃত হন।
নেতাদের নিয়ে নিজের আসনে বসিয়ে রাখার এমন ভিডিও এবং স্থির চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনকি গণমাধ্যমেও উঠে আসে। ভাইরাল হয় সেই তোষামোদির দৃশ্য। পুরো উপজেলা জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এ নিয়ে। আলোচিত এই ইউপি চেয়ারম্যান ইসহাককে ঘিরে একাধিক সময়ে সীমাহীন অনিয়মের সমালোচনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্যানেল চেয়ারম্যান ইসহাক রানার বিরুদ্ধে ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য গিয়াসউদ্দিন ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর সুনির্দিষ্টভাবে একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন নিকলীর ইউএনও রেহেনা মজুমদার মুক্তির বরাবরে। গিয়াসউদ্দিনের অভিযোগ ছায়া তদন্তের নামে একটি তদন্ত হলেও মিলেনি প্রতিকার। এছাড়াও একাধিক ইউপি সদস্যের ক্ষোভের ভাষ্যমতে, ইসহাক রানার সাথে যে সব ইউপি সদস্যের আঁতাত নেই, তারা সকলেই তুলনামূলক অধিকারবঞ্চিত।
জারইতলার এ ইউনিয়ন পরিষদ ঘিরে সীমাহীন অভিযোগ একেরপর এক জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে নানাবিধ সেবার মানে। হয়রানি এবং অনিয়ম প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান ইসহাক রানা দায় এড়িয়ে গেলেও পরোক্ষ মদদে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ মিলে সরেজমিনে। স্থানীয় অসংখ্য দুস্থ ও অসহায়েরা জানান, প্যানেল চেয়ারম্যান ইসহাক রানা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে স্বজনপ্রীতি ব্যাপকহারে বেড়েছে। সৌদি সরকারের দেয়া দুম্বার মাংস ও খেজুর পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে একটুকরোও জুটেনি। সুনির্দিষ্টভাবে এমন অনিয়মের অসংখ্য চিত্র দুস্থ অসহায়েরা তুলে ধরেন।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারী আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম অনেকখানি আফসোস এবং ক্ষোভ মিশ্রিত ভাষায় জানান, নিকলীতে নানাবিধ অপকর্ম হচ্ছে একরপর এক। প্রতিবাদের ফল স্তব্ধ। দলের পক্ষে তাদের অধিকাংশর অবস্থান স্পষ্ট হলেও তাদে কাছে মনে হচ্ছে যেনো তারাই বিরোধী পক্ষ। দুস্থ অসহায়ের বরাদ্দকৃত চালের অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তেরও দাবি জানান।
নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় কখনো দল নেবে না। দুস্থ অসহায়ের সাথে এমন অনিয়ম কখনো কাম্য নয়। তাছাড়াও দলীয় প্রসঙ্গে টেনে প্যানাল ইসহাক রানাকে সাংগঠনিক অনিয়মের দায়ে দলীয় পদ পদবী থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। এছাড়াও ৩নং কারপাশা এবং জারইতলা ইউনিয়নের ইউপি পরিষদের সকল প্রকারের অনিয়ম খতিয়ে দেখার বিষয়েও আহ্বান জানান প্রশাসনের উর্ধ্বতন মহলে।
নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তিকে জারইতলার ইউনিয়ন পরিষদের ঈদুল ফিতরের দুস্থ অসহায়ের মাথাপিছু ১০ কেজি চালের অনিয়ম প্রসঙ্গে ৪ এপ্রিল দুপুরের দিকে মুঠোফোনে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি জব্দকৃত চালের কথা স্বীকার করেন। এক পর্যায়ে সেই চাল এতিমখানায় দিয়ে দেয়া হবে বলেও জানান। তাছাড়াও অনিয়মের সাথে প্যানেল চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক জবাব এড়িয়ে চলেন।